Sunday, May 27, 2018

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট: স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক হিসাব

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এখন মহাকাশে। দেশের প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট নিয়ে সাধারণের কৌতূহলের অন্ত নেই। আমার নিজেরও ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে এ সম্পর্কে জানার। কেউ যখন বলেন, নিজস্ব স্যাটেলাইট পাঠিয়ে আমাদের লাভ কী? প্রথমেই বলবো, বড় লাভ এই আগ্রহের সৃষ্টি হওয়া। বিশেষ করে, নতুন প্রজন্মের মাঝে মহাকাশ সংক্রান্ত উচ্চতর প্রযুক্তি নিয়ে ভাবনার সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামনে মহাকাশ নিয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হওয়াটাই বড় অর্জন। এরপর বলা যেতে পারে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে। যে অংকের টাকা এটি তৈরি ও পাঠাতে খরচ হয়েছে, তা এটি দিয়ে ব্যবসা করে তুলে নেওয়া যাবে কি-না? এই মুহূর্তে এই প্রশ্নের উত্তর চট দেওয়া যাবে না এবং উত্তরটি জরুরিও নয় বলে মনে হয়। কারণ রাষ্ট্র এটা উৎক্ষেপণ করেছে শুধু আজকের লাভের চিন্তায় নয়, ভবিষ্যতের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে। অতএব এক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে বড় পরিসরে কল্যাণের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
 
বাংলাদেশ ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে, এর চেয়েও বড় তাৎপর্য হচ্ছে বাংলাদেশ সাহস দেখিয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে মর্যাদার আসনে পৌঁছে দিতে একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিশ্বের অনেক ধনী দেশেরও এখন পর্যন্ত নিজস্ব স্যাটেলাইট নেই। তারা হয়তো প্রয়োজন মনে করেনি, যা বাংলাদেশ করেছে। এখন জরুরি হচ্ছে- যেসব প্রয়োজন এবং সম্ভাবনাকে সামনে রেখে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে তা কত সহজে এবং কম সময়ে অর্জন করা যায় তা নিয়ে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে পেশাদার ব্যস্থাপনা তৈরি করা।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ হচ্ছে 'ব্রডকাস্টিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন' বা সম্প্রচারধর্মী। এটাকে কারিগরি ভাষায় বলা হয় 'জিওস্টেশনারি' স্যাটেলাইট। এই চরিত্রের স্যাটেলাইট অনেকটা আয়নার মত। একটা অবস্থান থেকে সংকেত পাঠিয়ে তা স্যাটেলাইটে প্রতিফলিত করে যেখানে পাঠাতে চাই, সেখানেই পাঠানো যায়। আমাদের স্যাটেলাইটের সক্ষমতার আকার বোঝা যায় এর শরীরে থাকা ট্রান্সপন্ডার নামক ডিভাইস দিয়ে। ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের একটি স্যাটেলাইট অবশ্যই বড় সক্ষমতার। তবে এই সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে তা নির্ভর করে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ওপর।
পরিকল্পনার শুরুটাও ভালো। আমাদের স্যাটেলাইটের অবস্থান যেহেতু ইন্দোনেশিয়ার ওপর এবং ওই অঞ্চলের দেশগুলো থেকে এর সংকেত অনেকটা লম্বালম্বিভাবে (৯০ ডিগ্রি কৌণিক অবস্থানের কাছাকাছি) পাওয়া যাবে, সে কারণে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে দু'টি ভূ-উপগ্রহ উপকেন্দ্রও খোলা হচ্ছে। নিশ্চিভাবে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা সামনে রেখেই এ সিদ্ধান্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের ভেতরে এর বাণিজ্যিক সফলতার সম্ভাবনা কতটুকু?
কক্ষপথে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কৌণিক অবস্থান ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। দেশের একাধিক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলে যেটা বোঝা যাচ্ছে, দেশের টিভিগুলোর জন্য এই কৌণিক অবস্থান থেকে টিভি সম্প্রচারের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে সংকেত পেতে হলে অ্যান্টেনা ৪৫ ডিগ্রি বা তার কাছাকাছি কৌণিক অবস্থানে রাখতে হবে। এর ফলে নির্বিঘ্ন টিভি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। কারিগরি উন্নয়নের মাধ্যমে এই সংকট নিশ্চয় দূর করার চেষ্টা হবে।
তবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশে ডিটিএইচ প্রযুক্তির মাধ্যমে দর্শকদের ঘরে ঘরে স্যাটেলাইট টেলিভিশন সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি সহজ হবে, সন্দেহ নেই। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের যে কারিগরি চরিত্র তাও ডিটিএইচ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্যই সবচেয়ে বেশি উপযোগী, বিশেষজ্ঞরা এমন কথাই বলছেন। এখন কেবলের মাধ্যমে দর্শকের ঘরে টেলিভিশন সম্প্রচার সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে দর্শকের চ্যানেল নির্বাচনের স্বাধীনতা নেই। কিন্তু ডিটিএইচ প্রযুক্তিতে দর্শক নিজের পছন্দমত চ্যানেল নির্বাচনের স্বাধীনতা পাবেন। যদিও এখন কেবল অপারেটররা এরই মধ্যে ডিজিটাল সেটটপ বক্স প্রযুক্তিতে সেবা দেওয়া শুরু করেছে, সেখানে ডিটিএইচ ব্যবসাকেও শক্ত প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ পাওয়া যাবে। এই ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে দেশের দুর্গম অঞ্চল যেখানে ফাইবার অপটিক কেবল পৌছাঁনো সম্ভব হয়নি সেখানে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া যাবে। তবে এটা সত্যি স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ব্যবহার অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল। ফলে এই ব্যান্ডউইথের বাণিজ্যিক ব্যবহারের চিন্তা হয়তো সংশ্লিষ্টরা করবেন না। তার চেয়ে দুর্গম অঞ্চলের নাগরিকদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিতেই প্রাধান্য দেবেন। ইন্টারনেটের পাশাপাশি স্যাটেলাইটভিত্তিক টেলিফোন সেবাও এসব দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছৈ দেওয়া যাবে।
এখন আসি কার্যকর পরিকল্পনার প্রসঙ্গে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার কোন অভাব নেই। এক কথায় বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারই একমাত্র সরকার যারা দেশে ডিজিটাল সেবা তৃণমূলে পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা আছেন তারা অনেক ক্ষেত্রে জনগণের কাছে সেই সেবা সফলভাবে নিয়ে যেতে পারছেন না। যেমন সি-মি-ইউ-৫ বা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়া ছিল দেশের জন্য যুগান্তকারী একটি ঘটনা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন ব্যান্ডউইথে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু সেই ব্যান্ডউইথ আমরা ব্যবহার করতে পারছি না শুধু ঢাকা-কুয়াকাটার মধ্যে একটি কার্যকর ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনের ব্যর্থতায়। এক হাজার পাঁচশ' জিবিপিএস সক্ষমতার মধ্যে মাত্র দুশ' জিবিপিএস ব্যবহার করা যাচ্ছে দুর্বল লিংক স্থাপনের কারণে। এখানে একটি কার্যকর, সক্ষম ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনে রাষ্ট্রায়াত্ত কোম্পানি বিটিসিএল সফল হয়নি।
একইভাবে রাজধানীকে অত্যাধুনিক ট্রিপল প্লে নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সরকার খুবই ভাল একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছিল বিটিসিএলকে। এর মাধ্যমে রাজধানীবাসী একটি মাত্র সংযোগ দিয়ে কেবল টিভি, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং টেলিফোনে কথা বলার সুবিধা পাবেন। প্রায় চারশ' কোটি টাকা ব্যয়ের সেই প্রকল্প বাস্তবায়নেও সফল হয়নি বিটিসিএল। প্রায় তিন বছর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও ঢাকার মানুষের কাছে এ সেবা এখন পর্যন্ত পৌঁছেনি। শুধু বিটিসিএল নয়, টেলিযোগাযোগ খাতের রাষ্ট্রায়াত্ত পাঁচটি কোম্পানির কার্যক্রমের চেহারা একইরকম।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় আরও একটি রাষ্ট্রায়াত্ত কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানির সামনে অন্য পাঁচটি কোম্পানির চেয়ে চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। কারণ জিওস্টেশনারি ক্যাটাগরির অর্ধ শতাধিক কোম্পানি আগে থেকে বিশ্বজুড়ে সফলভাবে ব্যবসা করে আসছে। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিশ্চিতভাবেই সহজ হবে না।
এ কারণে সরকারের নীতি নির্ধারকদের প্রথম থেকে জোর দিতে হবে নবগঠিত কোম্পানি সফলভাবে পরিচালনায়। আমলানির্ভর অদক্ষ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে কার্যকর পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে শুরু থেকেই। কারণ একবার হতাশার সৃস্টি হলে হতাশ প্রতিষ্ঠানকে খুব বেশি দূর নিয়ে যাওয়া যায় না। যার প্রমাণ টেলিটক, টেশিস, বিটিসিএল, খুলনা কেবল শিল্প কিংবা বিএসসিসিএল। বাজারে বেসরকারিখাতে কোন সাবমেনির কেবল কোম্পানি না থাকায় বিএসসিসিএল কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু তারপরও ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ নিয়ে আসা আইটিসি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সবকিছুর পরও আমরা আশাবাদী। কারণ বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বেতবুানিয়ায় ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন, সেই স্বপ্ন মহীরূহে পরিণত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা জানি বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটই প্রথম নয়, এরপর আরও একাধিক স্যাটেলাইট পাঠাবে বাংলাদেশ। শুধু জিওস্টেশনারি নয়, ভবিষ্যতে জিপিএস, ওয়েদার ক্যাটাগরির নিজস্ব স্যাটেলাইটও মহাকাশে থাকবে। দেশের তরুণদের ভেতর থেকেই মহাকাশ গবেষণায় অসাধারণ প্রতিভা বের হয়ে আসবে; যারা বিশ্বে বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে মর্যাদার আসনে, নতুন উচ্চতায়।
লেখাঃ রাশেদ মেহেদী/


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 মন্তব্য(গুলি):